অগ্রক্রয়: জমির মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি জটিল আইনগত অধিকার (Preemption: A legal right to reestablish the standing of land)




জমির মালিক যদি তার জমি বিক্রি করতে চান, তবে প্রথমত তার সহ-অংশীদারদের (অগ্রক্রয়ের অধিকারী) বিক্রয়ের তথ্য জানাতে হয়। এ তথ্য জানার পর তারা যদি ক্রয়ের আগ্রহ না দেখায়, তখনই জমি বাইরের কোনো ক্রেতার কাছে বিক্রি করা যায়। তবে যদি বিক্রয়ের খবর বা নোটিশ না দিয়ে জমি বিক্রি করা হয়, তাহলে সহ-অংশীদাররা আইনত প্রিয়েমশন মামলা (অগ্রক্রয় মামলা) দায়েরের মাধ্যমে জমি পুনঃক্রয় করতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব, কারা এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে, কীভাবে মামলা দায়ের করতে হয়, এবং কোন পরিস্থিতিতে এই অধিকার সীমাবদ্ধ থাকে।

অগ্রক্রয়ের অধিকার কী?

 জমি বহিরাগত কোনো ক্রেতার কাছে বিক্রির পর সহ-অংশীদার যদি আদালতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ জমির মূল্য প্রদান করেন, তবে তিনি ওই জমি পুনঃক্রয় করতে পারেন। বাংলাদেশে এই অধিকার রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এবং অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ দ্বারা সুরক্ষিত। একইসঙ্গে মুসলিম আইনেও এই অধিকার গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত।

মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে, এই অধিকার প্রয়োগ করতে হলে "তলব-ই-মৌসিবত" ও "তলব-ই-ইশাদ" নামে দুটি আনুষ্ঠানিক দাবি পেশ করতে হয়। এ দুটি দাবির মধ্যে প্রথমটি বিক্রয়ের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশ করতে হয়, এবং দ্বিতীয়টি সাক্ষীদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করতে হয়। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রীয় আইনে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক দাবি প্রয়োজন হয় না, তবে মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত অর্থ আদালতে জমা দিতে হয়।


অগ্রক্রয়ের অধিকার কখন এবং কীভাবে জন্মায়?

১. যখন জমির মালিক সহ-অংশীদার ব্যতীত তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রি করে এবং তা নিয়ে বিক্রয়ের নোটিশ জারি করে।
২. যদি বিক্রয়ের কোনো নোটিশ না থাকে, তবে সহ-অংশীদার বিক্রয়ের খবর জানার দিন থেকে এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
৩. রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুসারে বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধনের পর সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে প্রিয়েমশন মামলা দায়ের করা যায়।


অগ্রক্রয়ের মামলা করার নিয়ম

মামলা দায়ের করতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে হয়:
১. বিক্রির দলিল নিবন্ধনের তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
২. বিক্রির দলিলে উল্লেখিত মূল্যের ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ এবং বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ মামলার আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
৩. যদি ক্রেতা বিক্রীত জমিতে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করে থাকে, তবে তার জন্য অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রদান করতে হবে।

মুসলিম আইন অনুসারে, মামলার রায় হওয়ার আগে কোনো অর্থ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।


অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের যোগ্য ব্যক্তিরা

১. বিক্রীত জমির উত্তরাধিকার সূত্রে সহ-অংশীদার।
২. ক্রয়সূত্রে সহ-অংশীদার।
৩. জমিসংলগ্ন সম্পত্তির মালিক।

২০০৬ সালের সংশোধনী অনুসারে, পার্শ্ববর্তী জমির মালিকের এই অধিকার বিলুপ্ত করা হয়েছে।

আরো পড়ুনঃ জমি দখল ও উদ্ধার: বাংলাদেশি আইনের আলোকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি


অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের বাধা

অগ্রক্রয়ের মামলা করা যায় না, যদি—
১. বিক্রীত জমি বসতবাড়ি হয়।
২. জমি বিক্রয়ের পর পুনরায় বিক্রেতার কাছে হস্তান্তরিত হয়।
৩. জমি হেবা-বিল-এওয়াজ, উইল বা দানসূত্রে স্থানান্তরিত হয়।
৪. রক্তসম্পর্কিত তিন পুরুষের মধ্যে দান বা উইলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরিত হয়।


আদালতের নির্দেশনা

মামলার শুনানি শেষে আদালত যদি প্রিয়েমশন মঞ্জুর করেন, তাহলে আবেদনকারীকে জমি কেনার অধিকার প্রদান করেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী আবেদনকারীকে জমি রেজিস্ট্রির জন্য ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রয় দলিল সম্পাদন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পাদন না হলে, আদালত নিজেই জমির রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন।


আপিল ও রিভিশনের সুযোগ

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারার অধীনে প্রথম আপিল করা যায়। তবে এই আপিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোনো আপিল করা যাবে না। যদিও দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারার অধীনে রিভিশন করার সুযোগ রয়েছে।

শেষ কথা:
অগ্রক্রয় একটি আইনগত অধিকার, যা ভূমির যৌথ মালিকানা সুরক্ষিত রাখতে এবং বহিরাগতদের জমি দখল ঠেকাতে সহায়তা করে। তবে এই অধিকার প্রয়োগে সময়সীমা এবং শর্তাবলী কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন