![]() |
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কী?
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বলতে বোঝায় একটি লিখিত দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (প্রিন্সিপাল) আরেকজন ব্যক্তিকে (অ্যাটর্নি বা এজেন্ট) তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন কাজ করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করেন। এটি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক চুক্তি পর্যন্ত যেকোন কাজের জন্য হতে পারে।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রধানত দুই প্রকারের:
১. সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: বিভিন্ন সাধারণ কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন: সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া, ব্যবসায়িক লেনদেন ইত্যাদি।
২. বিশেষ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি: নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন: নির্দিষ্ট সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা প্রদান।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর উদ্দেশ্য
এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো:
১. ক্ষমতা অর্পণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান।
২. অপব্যবহার প্রতিরোধ ও প্রাসঙ্গিক পক্ষের অধিকার সুরক্ষা।
৩. যেসব ব্যক্তি বিদেশে থাকেন, তাদের পক্ষ থেকে কাজ পরিচালনা করা সহজ করা।
৪. নোটারি পাবলিক বা রেজিস্ট্রার কর্তৃক দলিল রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদানের ধাপ
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করতে হলে নিম্নলিখিত ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
১. দলিল প্রস্তুত
একটি লিখিত দলিল তৈরি করতে হবে, যেখানে কাজের ধরণ এবং ক্ষমতার সীমানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
২. নোটারি পাবলিক বা রেজিস্ট্রারের অনুমোদন
দলিলটি নোটারি পাবলিক বা রেজিস্ট্রার কর্তৃক স্বাক্ষর ও অনুমোদিত হতে হবে। এটি দলিলটির বৈধতা নিশ্চিত করে।
৩. চুক্তি সম্পাদন
ক্ষমতা প্রদানকারী (প্রিন্সিপাল) এবং ক্ষমতা গ্রহণকারী (অ্যাটর্নি) মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদন করা আবশ্যক।
৪. সাক্ষী ও রেকর্ড সংরক্ষণ
দলিলের সাথে অন্তত দুজন সাক্ষীর সাক্ষর থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া দলিলের একটি কপি রেকর্ড হিসাবে সংরক্ষণ করা উচিত।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বৈধতা ও সীমাবদ্ধতা
আইন অনুযায়ী, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বৈধতা নির্ভর করে এর সুনির্দিষ্টতা এবং নিবন্ধনের উপর।
নিবন্ধন প্রয়োজনীয়:
১. সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তর সংক্রান্ত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি।
২. ১ বছরের বেশি মেয়াদের কোনো ক্ষমতা।
সীমাবদ্ধতা:
১. পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কোনো অবৈধ কাজ করা যাবে না।
২. এটি শুধুমাত্র নির্ধারিত কাজের জন্য প্রযোজ্য।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের নিয়ম
যদি প্রিন্সিপাল তার দেওয়া ক্ষমতা বাতিল করতে চান, তাহলে:
১. লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে।
২. নোটিশটি নোটারি পাবলিক বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে প্রেরণ করতে হবে।
৩. বাতিলের কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
যদি অ্যাটর্নি মারা যান বা প্রিন্সিপাল তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, তবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির অপব্যবহার: আইনি ব্যবস্থা
পাওয়ার অব অ্যাটর্নির অপব্যবহার একটি গুরুতর অপরাধ। যেমন:
১. অ্যাটর্নি তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলে।
২. প্রতারণা বা প্রিন্সিপালের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে।
আইন অনুযায়ী, অপব্যবহারের ক্ষেত্রে:
- আদালত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করতে পারে।
- দোষী ব্যক্তিকে জরিমানা বা শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এর ধারা
আইনটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো:
১. ধারা ৩: পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের বৈধতা নিশ্চিত করা।
২. ধারা ৫: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
৩. ধারা ৭: ক্ষমতা অর্পণ ও বাতিলের নিয়ম।
৪. ধারা ৯: অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং শাস্তির বিধান।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১. প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সহায়ক
যারা বিদেশে অবস্থান করেন, তারা এই আইনের মাধ্যমে দেশে তাদের সম্পত্তি বা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
২. ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করা
একজন ব্যবসায়ী তার পক্ষে লেনদেন বা চুক্তি করার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন।
৩. সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় সুরক্ষা
এই আইন ক্ষমতা প্রদান ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ব্যবহারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস
১. সবসময় দলিলটি আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রস্তুত করুন।
২. দলিলে কাজের সীমানা ও সময়কাল উল্লেখ করুন।
৩. বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে অ্যাটর্নি হিসাবে নির্বাচন করুন।
৪. ক্ষমতা অর্পণের আগে এবং পরে সবকিছু নথিভুক্ত রাখুন।
উপসংহার
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এমন একটি আইন যা ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুশাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রিন্সিপালের সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং অ্যাটর্নির দায়িত্ব স্পষ্ট হয়। তবে ভুলভাবে ব্যবহার করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই, এই আইন সম্পর্কিত সব নিয়ম ও শর্ত সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি যদি এই বিষয়ে আরও জানতে চান, তবে একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। আইন মেনে চলুন, নিরাপদ থাকুন।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

