জমি বা সম্পত্তি বণ্টন: একটি সংক্ষিপ্ত গাইড (Distribution of Land or Property: A Brief Guide)

 

জমি বা সম্পত্তি বণ্টন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের দেওয়ানী আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে ভাগ করে নেওয়া বা যার যার প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে বাটোয়ারা মামলা একটি অপরিহার্য পদ্ধতি। এখানে জমি বণ্টনের পদ্ধতি, মামলা করার ধাপ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।


১। জমি বণ্টন কী?

ওয়ারিশ বা খরিদ সূত্রে প্রাপ্ত জমি সীমানা চিহ্নিত করে যার যার প্রাপ্ত অংশ বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে জমি বণ্টন বা বাটোয়ারা বলা হয়। যদি কোনো অংশীদার আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বণ্টন করতে রাজি না হন, তখন দেওয়ানী আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে হয়।


২। সম্পত্তির শরিকদের শ্রেণি

জমি বা সম্পত্তির শরিক দুই ধরনের হতে পারে:
১. উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক: উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া অংশীদার।
২. খরিদ সূত্রে শরিক: জমি ক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তির শরিক হওয়া।


৩। বাটোয়ারা মামলা করার প্রয়োজনীয়তা

বাটোয়ারা মামলা তখন প্রয়োজন হয়, যখন:
১. শরিকগণ নিজ নিজ প্রাপ্য জমির অংশ বুঝে নিতে চান।
২. কোনো শরিক তার অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
৩. এক বা একাধিক শরিক অন্যদের জমি নিজের অধিকারে রেখেছেন।
৪. শরিকগণ জমি ভাগ করতে রাজি হচ্ছেন না।


৪। বাটোয়ারা মামলা করার ধাপ

৪.১। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

বাটোয়ারা মামলা করার জন্য নিচের কাগজপত্রগুলো সংগ্রহ করতে হবে:
১. ভূমি জরিপ খতিয়ান।
২. নামজারি খতিয়ান।
৩. মালিকানা দলিল।
৪. উত্তরাধিকার সনদ।

৪.২। কোর্ট ফি

মামলা করতে ১০০ টাকা কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। তবে ছাহাম (মালিকানা অংশ) চাইলে প্রতি ছাহামের জন্য অতিরিক্ত ১০০ টাকা দিতে হয়।

৪.৩। প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রি

  • প্রাথমিক ডিক্রি: আদালত হিস্যা অনুযায়ী বণ্টনের আদেশ দেন।
  • চূড়ান্ত ডিক্রি: প্রয়োজনে আমিন কমিশন পাঠিয়ে সীমানা চিহ্নিত করে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।


৫। বণ্টনের শর্তসমূহ

বাটোয়ারা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কয়েকটি শর্ত মানতে হয়:
১. জমির সীমানা সঠিকভাবে পরিমাপ করা।
২. বণ্টন তালিকায় প্রত্যেক শরিকের অংশ উল্লেখ থাকা।
৩. তালিকায় মালিকানার বিভাজন স্বচ্ছ ও স্বীকৃত হওয়া।
৪. স্ট্যাম্প শুল্ক দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা।
৫. সকল শরিকের স্বাক্ষর থাকা।


৬। আপস-মীমাংসার গুরুত্ব

বাটোয়ারা মামলা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। তাই শরিকগণ যদি নিজেদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করতে সক্ষম হন, তবে সময় ও খরচ বাঁচে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩খ ধারায় আপসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


৭। মেয়েদের বাটোয়ারা মামলা করার অধিকার

অনেকেই মনে করেন মেয়েরা বাটোয়ারা মামলা করতে পারে না। এটি ভুল ধারণা। নারীরা তাদের অংশের জমি উদ্ধার করার জন্য আইনানুগ অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এমনকি বিধবা নারীও স্বামীর অংশের বাটোয়ারা দাবি করতে পারেন।


৮। বাটোয়ারা মামলা নিষ্পত্তির পর করণীয়

১. নিজ নামে নামজারি সম্পন্ন করতে হবে।
২. জমাভাগ খতিয়ান ও খাজনা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সম্পত্তির রেকর্ড আপডেট রাখতে হবে।


৯। দখল বুঝে না পেলে করণীয়

বাটোয়ারা মামলা নিষ্পত্তির পরও দখল বুঝে না পেলে:
১. উচ্ছেদের মামলা করতে হবে।
২. হুমকি পেলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে।
৩. প্রয়োজন হলে আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।


১০। বাটোয়ারা মামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

  • জমি ভাগ নিয়ে পরিবারে জটিলতা কমায়।
  • প্রতিটি শরিকের অধিকার সুরক্ষিত করে।
  • আদালতের মাধ্যমে জমির সঠিক মালিকানা নিশ্চিত হয়।

উপসংহার

জমি বণ্টনের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হলে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও জটিলতা এড়ানো সম্ভব। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সঠিক আইনি পদ্ধতির মাধ্যমে বাটোয়ারা মামলা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বণ্টন করলে সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হয়।

আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।

প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন