ভূমিকা
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে। এই আইনটি মূলত প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু আইন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন দ্বারা প্রভাবিত। যদিও বাংলাদেশে অধিকাংশ আইন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের জন্য প্রণীত, হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মীয় আইন সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এই আইন নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক হওয়ায় বর্তমান সময়ে এটি সংস্কারের দাবি উঠেছে।
দায়ভাগা ও মিতাক্ষরা পদ্ধতির ভিত্তি
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন বিশেষ করে দয়াভাগা (Dayabhaga) এবং মিতাক্ষরা (Mitakshara) নামক দুটি প্রথার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
২.১ দায়ভাগা পদ্ধতি
👉বাংলার হিন্দু সমাজে প্রচলিত।
👉সম্পত্তি বণ্টন পিতার মৃত্যুর পর হয়।
👉নারীদের কিছু অধিকার থাকলেও তা সীমিত।
২.২ মিতাক্ষরা পদ্ধতি
👉ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত।
👉পুরুষ সদস্যরা যৌথ পারিবারিক সম্পত্তির সহ-মালিক হন।
👉নারীদের সম্পত্তির অধিকার প্রায়শই উপেক্ষিত।
হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন নিম্নলিখিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
৩.১ সম্পত্তির অধিকার
👉হিন্দু পুরুষদের সাধারণত বেশি অধিকার দেওয়া হয়।
👉নারীরা সম্পত্তির মালিক হতে পারলেও বিক্রয় বা হস্তান্তরের অধিকারে সীমাবদ্ধ।
৩.২ নারীর সম্পত্তি অধিকার
👉 বিধবা স্ত্রী জীবনকালীন ভোগের অধিকার পান, কিন্তু বিক্রয়ের অধিকার নেই।
👉 কন্যারা পিতার সম্পত্তির অধিকার পেলেও তা ভাইদের তুলনায় কম।
👉 ২০০৫ সালের ভারতীয় হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সংস্কার নারীদের অধিকার বাড়ালেও বাংলাদেশে তা কার্যকর হয়নি।
৩.৩ যৌথ পারিবারিক সম্পত্তি
👉যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে সাধারণত পুরুষ সদস্যদের অগ্রাধিকার থাকে।
👉নারীরা সাধারণত সীমিত অধিকার পান।
উত্তরাধিকারী শ্রেণি
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে উত্তরাধিকারীদের তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে:
১. প্রথম শ্রেণি: পুত্র, কন্যা, বিধবা স্ত্রী। ২. দ্বিতীয় শ্রেণি: নাতি-নাতনি, ভাইবোন, পিতামাতা। ৩. তৃতীয় শ্রেণি: অন্যান্য আত্মীয়স্বজন।
নারীদের প্রতি বৈষম্য ও আইনি চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। প্রধান কিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে:
👉সম্পত্তি অধিকার সীমিত: নারীরা উত্তরাধিকার পেলেও তা ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
👉আইনি সংস্কারের অভাব: ১৯৫৬ সালের ভারতীয় হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের মতো বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
👉সামাজিক বাধা: অনেক ক্ষেত্রে নারীরা সামাজিক কারণে সম্পত্তির অধিকার দাবি করেন না।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। নারীদের সম্পত্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. আইনি সংস্কার: ভারতীয় আইনের অনুকরণে বাংলাদেশেও নারীদের সম্পত্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ২. সচেতনতা বৃদ্ধি: নারীদের সম্পত্তি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। ৩. সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন: পরিবারের ভেতর নারীদের অধিকার স্বীকৃত করা।
উপসংহার
বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কার না হলে নারীরা ভবিষ্যতেও বৈষম্যের শিকার হবেন। এটি শুধুমাত্র নারীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন নয়, এটি সামগ্রিক সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। তাই, বর্তমান সময়ের দাবি অনুযায়ী আইন পরিবর্তন করে নারী-পুরুষের সমান সম্পত্তি অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)