চেক আমাদের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ঋণ পরিশোধ বা আর্থিক বাধ্যবাধকতা মেটানোর জন্য চেক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনেক সময়, পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় বা বিভিন্ন ত্রুটির কারণে চেকটি ব্যাংক দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় চেক ডিজঅনার। এই প্রবন্ধে চেক ডিজঅনারের কারণ, প্রতিকার, এবং আইনগত প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে।
চেক ডিজঅনার কী এবং কেন হয়?
চেক ডিজঅনার তখন ঘটে যখন চেক জমা দেওয়ার পর ব্যাংক সেটি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
অপর্যাপ্ত তহবিল: চেক ইস্যুকারীর অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা।
স্বাক্ষর মেলেনি: চেকে উল্লেখিত স্বাক্ষর ব্যাংকের নথির সাথে মিল না খাওয়া।
চেকের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া: চেক ইস্যু করার ছয় মাস পর এটি জমা দিলে।
ত্রুটিপূর্ণ চেক: চেকের তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকলে।
চেকের ঘষামাজা বা পরিবর্তন: চেকের উপর যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা কালি মুছে পুনরায় লেখা।
চেক ডিজঅনার হলে করণীয়
চেক ডিজঅনার হলে আপনি নীচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
ব্যাংকের রিসিপ্ট সংগ্রহ করুন
ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনারের কারণ উল্লেখ করে একটি লিখিত নথি (রিটার্ন মেমো) সংগ্রহ করুন।
আইনি নোটিশ পাঠান
ডিজঅনারের ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারীকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে টাকা পরিশোধের দাবি করুন।
মামলা দায়ের করুন
যদি নোটিশ পাওয়ার পরও ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করা হয়, তবে আপনি হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ (Negotiable Instruments Act) এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী মামলা করতে পারেন।
চেক ডিজঅনার মামলার প্রক্রিয়া
নালিশি মামলা দায়ের
মামলা দায়েরের জন্য মূল চেক, ডিজঅনারের রসিদ, নোটিশের কপি, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি আদালতে জমা দিতে হবে।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা পরিচালনা
মামলা গ্রহণের পর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।
দায়রা আদালতে বিচার
মামলা মূলত দায়রা আদালতে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করা হয়।
চেক ডিজঅনার মামলার শাস্তি
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, চেক ডিজঅনার একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। শাস্তি হতে পারে:
জেল: সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড।
জরিমানা: চেকের টাকার তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা।
উভয় দণ্ড: প্রয়োজন অনুযায়ী উভয় শাস্তি একসঙ্গে দেওয়া হতে পারে।
চেক ডিজঅনার মামলা প্রতিরোধে করণীয়
চেক ডিজঅনার থেকে রক্ষা পেতে নীচের পরামর্শগুলো মেনে চলুন:
ব্যক্তিগত তহবিল নিশ্চিত করুন
চেক ইস্যুর আগে নিশ্চিত করুন যে আপনার অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা রয়েছে।
সতর্কতার সাথে চেক পূরণ করুন
চেক লেখার সময় তারিখ, নাম, এবং টাকার পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
চেকের পাতা সাবধানে রাখুন
চেকবই হারিয়ে গেলে অবিলম্বে ব্যাংকে জানিয়ে পদক্ষেপ নিন।
চালানের রসিদ সংরক্ষণ করুন
যেকোনো আর্থিক লেনদেনের জন্য চালানের রসিদ বা নথি রাখুন।
চেক ডিজঅনার মামলা দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় নথি
চেক ডিজঅনার মামলার জন্য নীচের নথিগুলো জমা দিতে হবে:
- চেকের মূল কপি।
- ব্যাংকের ডিজঅনারের রিসিপ্ট।
- আইনি নোটিশের কপি।
- পোস্টাল রসিদ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র।
- চেক লেনদেন সম্পর্কিত অন্যান্য নথি।
আইনের নতুন সংশোধনী
২০২০ সালে বিনিময়যোগ্য দলিল আইন নামে নতুন খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়। এর অধীনে, চেক ডিজঅনার মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি:
৬ মাস থেকে ২ বছর কারাদণ্ড
চেকের টাকার ৪ গুণ পর্যন্ত জরিমানা
অন্য আইনে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ
যদি চেক ডিজঅনার মামলা যথাসময়ে দায়ের না হয়, তবে আরও দুটি আইনি বিকল্প রয়েছে:
ফৌজদারি মামলা (ধারা ৪০৬ ও ৪২০)
চেক ইস্যু করার সময় প্রতারণার অভিযোগ আনা যেতে পারে।
দেওয়ানি মামলা
সম্পূর্ণ টাকা আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যেতে পারে।
উপসংহার
চেক ডিজঅনার একটি গুরুতর আর্থিক অপরাধ, যা আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য। তাই চেক ইস্যু এবং গ্রহণের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি চেক ডিজঅনার মামলায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন এবং আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
