বিদেশে থাকা স্বামীকে তালাক দেওয়ার আইনগত প্রক্রিয়া (Legal process for divorcing a husband living abroad)


আপনার স্বামী দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন, কিন্তু তিনি আপনাকে বা আপনার সন্তানদের কোনো খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না কিংবা ভরণপোষণ দিচ্ছেন না। উল্টো তিনি ও তার পরিবার আপনাকে নানা অপবাদ দিচ্ছেন। এমতাবস্থায়, আপনি তার সঙ্গে আর সংসার করতে না চাইলে তাকে তালাক দিতে পারেন এবং পরবর্তীতে অন্যত্র বিয়েও করতে পারেন। চলুন জেনে নিই, কীভাবে এটি সম্ভব।

 কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা

আপনার বিয়ের কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি তালাক প্রদানের ক্ষমতা আপনাকে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে আপনি নিজেই স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন। বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী (৯ ডিএলআর ৪৫৫ পৃষ্ঠা), স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনে অপারগ হন, তবে স্ত্রী নিজ নফসের প্রতি তালাকের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

 তালাক দেওয়ার প্রক্রিয়া

তালাকের নোটিশ তৈরি

আপনার তালাকের কারণ উল্লেখ করে একটি লিখিত নোটিশ তৈরি করতে হবে। এতে উল্লেখ করতে হবে:

    👉কেন আপনি তালাক দিতে চান?

    👉স্বামীর দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার দিকগুলো কী কী?

     👉তালাক কার্যকরের তারিখ।

তালাক নোটিশ পাঠানো

আপনার তালাক নোটিশটি নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের কাছে পাঠাতে হবে: ১. স্বামীকে – যদি স্বামীর বিদেশের ঠিকানা জানা থাকে, তবে সেখানে পাঠাতে হবে। না জানা থাকলে তার দেশের স্থায়ী ঠিকানায় পাঠালেও চলবে। ২. স্বামীর পরিবার – তার পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয়দের কাছে নোটিশ কপি পাঠানো যেতে পারে। 3. স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়র – স্বামীর ঠিকানা যদি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে হয়, তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে, পৌরসভার মধ্যে হলে পৌরসভার মেয়রকে এবং সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে হলে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে তালাক নোটিশ পাঠাতে হবে।

আরো পড়ুনঃ  বাংলাদেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন: সম্পত্তি বণ্টনের বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ

তালাক কার্যকরের সময়সীমা

বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর ৯০ দিন পার হলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায়। যদি এ সময়ের মধ্যে কোনো আপোষ-মীমাংসা না হয়, তবে তালাক চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

তালাকের পরে পুনরায় বিয়ের নিয়ম

৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর আপনি নতুন বিয়ে করতে পারবেন। নতুন বিয়ের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:

        👉যথাযথ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন করা।

        👉কাবিননামায় সব শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।

তালাকের পর আইনি ঝামেলা

স্বামীর মামলা করার সুযোগ

তালাকের পর স্বামী বা তার পরিবার আপনার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কোনো প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কারণ:

    👉স্ত্রী যদি স্বামীর সম্পদ আত্মসাৎ না করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না।

    👉দেনমোহর পরিশোধের দায়িত্ব স্বামীর, তাই এটি স্ত্রী আদায় করতে পারেন।

    👉সন্তান থাকলে স্বামীকে তাদের ভরণপোষণ দিতে হবে।

তালাকের আনুমানিক খরচ

তালাকের জন্য আইনজীবীর সহযোগিতা নিতে চাইলে আনুমানিক ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা খরচ হতে পারে। তবে আপনি নিজে তালাক নোটিশ পাঠালে বিশেষ কোনো খরচ হবে না, শুধুমাত্র ডাক ব্যয়ের টাকা ছাড়া।

উপসংহার

স্বামী যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে স্ত্রী বৈধভাবে তাকে তালাক দিতে পারেন। তালাকের ৯০ দিন পর নতুন বিয়েও করতে পারেন। তালাক প্রক্রিয়াটি সহজ এবং এতে বিশেষ আইনি জটিলতা নেই। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিন এবং আপনার ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর করুন।


আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।

প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন