মানহানি হলে কি করবেন?



ভাবুন তো আপনি নিজের মতো করে শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কেউ আপনার নাম নিয়ে বাজে কথা ছড়াতে শুরু করল। কেউ বলছে আপনি অসৎ, কেউ বলছে আপনি চরিত্রহীন। ফেসবুকে, অফিসে, কিংবা আশপাশের মানুষজনের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে মিথ্যা আর কুৎসা। একসময় আপনি দেখলেন, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে গেছে। অপমানের সেই তীব্র কষ্টটা কেবল যিনি ভুক্তভোগী, তিনিই জানেন। কিন্তু এক্ষেত্রে হতাশ হবার কারন নেই  কারন  এ সমস্যা থেকে সমাধানের জন্য আছে আইন আপানার পাশে।

 বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কারও সুনাম, মর্যাদা বা খ্যাতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কেউ যদি মিথ্যা কথা বলে, লেখে বা প্রচার করে, সেটি মানহানি বা Defamation হিসেবে গণ্য হবে। দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির সম্পর্কে এমন কথা বলে যা তার আত্মীয়স্বজনের মর্যাদায় আঘাত হানে, তাহলেও তা মানহানি হিসেবে ধরা হবে।তবে আইন সব ক্ষেত্রে মানহানির অভিযোগ গ্রহণ করে না। এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম আছে। যেমন—জনস্বার্থে সত্যি কোনো বিষয় প্রকাশ করা হলে তা মানহানি নয়।আবার সরকারি কর্মচারীর কাজ নিয়ে সৎ বিশ্বাসে মন্তব্য করলে তাও মানহানি নয়। আদালতের কার্যবিবরণী বা জনসম্মুখে অনুষ্ঠিত কোনো অনুষ্ঠান সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করাও মানহানির অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি, কেউ যদি পুলিশের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে সৎ বিশ্বাসে কোনো অভিযোগ করেন, তাতেও মানহানি ধরা হবে না।

তবে এসব ব্যতিক্রমের বাইরে কেউ যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আপনাকে অপমান করে, সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে তাহলে আপনি ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারেন। দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় বলা হয়েছে, মানহানির অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বর্তমান সময়ে মানহানির বড় একটি ক্ষেত্র হলো অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কেউ যদি ফেসবুক, ইউটিউব বা সংবাদমাধ্যমে আপনার সম্পর্কে মিথ্যা, অপমানজনক বা কুৎসামূলক কিছু প্রকাশ করে, তাহলে সেটা আইনের অধীনে অপরাধ। এতে কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। 

এখন প্রশ্ন আসতে পারে—কে মানহানির মামলা করতে পারেন?
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারা অনুযায়ী, মানহানির মামলা সাধারণত ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজেই করতে পারেন। তবে যদি ভুক্তভোগী নারী হন এবং সামাজিক কারণে আদালতে হাজির হতে না পারেন, বা যদি তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক, মানসিকভাবে অসুস্থ বা শারীরিকভাবে অক্ষম হন—তাহলে তার স্বামী, পিতা বা অভিভাবক আদালতের অনুমতি নিয়ে তার পক্ষে মামলা করতে পারেন। যেমন, কোনো মেয়েকে নিয়ে কুৎসা রটানো হলে তার পিতা বা মাতা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে মামলা করতে পারবেন, কারণ মেয়ের অপমান মানে পরিবারের অপমান।

অন্যদিকে, আপনি চাইলে দেওয়ানি আদালতেও ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন। কেউ যদি আপনার মানহানি করে আপনাকে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে আপনি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। যদিও মান-মর্যাদার মূল্য টাকায় মাপা যায় না, তবু আইনের মাধ্যমে আপনি ক্ষতিপূরণের প্রতিকার চাইতে পারেন। দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী, মামলার মূল্যমান অনুযায়ী কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। 

সবশেষে একটা কথা—অপমানকে নীরবে সহ্য করবেন না।
কারণ কেউ যদি আপনার সম্মান নষ্ট করে, সেটা শুধু আপনাকে নয়, আপনার পরিবার ও সমাজকেও আঘাত করে। তাই ভয় নয়, এগিয়ে আসুন আইনের ভরসায়
আইনের পথে থাকলে আইন সবসময় আপনার পক্ষে থাকবে। মনে রাখবেন, নিজের মর্যাদা রক্ষা করা আপনার মৌলিক অধিকার। আইন সেই অধিকারই আপনাকে সুরক্ষা দেয়। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন