বায়না চুক্তি: একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ (Bayna Agreement: A Detailed Analysis)

 

যা জানতে পারবেন

  • বায়না চুক্তি কীভাবে কার্যকর হয়।
  • শর্ত ভঙ্গের পর করণীয়।
  • রেজিস্ট্রেশনের গুরুত্ব।

জমি বা সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বায়না চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কিছু শর্তাবলী নির্ধারিত হয় এবং উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়-দায়িত্ব স্পষ্ট হয়। বর্তমান ব্লগে বায়না চুক্তি সম্পর্কিত সব দিক আলোচনা করা হয়েছে।


১. বায়না চুক্তি কী?

বায়না চুক্তি বলতে বোঝায়, কোনো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে করা লিখিত চুক্তি। এটি চুক্তি আইন, ১৮৭২ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

বায়না চুক্তির বৈশিষ্ট্য:

  • সম্পত্তির আংশিক মূল্য প্রদান করা হয়।
  • চুক্তি লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে।
  • মালিকানা হস্তান্তর হয় না।

২. বায়না চুক্তির শর্তাবলী

একটি বায়না চুক্তিতে সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখ থাকে:

১. তফসিল: সম্পত্তির সঠিক বর্ণনা।
২. মূল্য নির্ধারণ: বাড়ি ও ভিটির আলাদা মূল্য।
৩. অবশিষ্ট টাকার পরিমাণ ও প্রদানের সময়সীমা।
৪. রেজিস্ট্রেশনের সময়সীমা।
৫. শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে করণীয়।
৬. দখল হস্তান্তর বিষয়ক শর্ত।


৩. বায়না চুক্তি থেকে মালিকানা সৃষ্টি হয় কি?

না, বায়না চুক্তি কোনো সম্পত্তিতে মালিকানা সৃষ্টি করে না।

  • এটি মালিকানা দলিল নয়।
  • বায়না চুক্তি থেকে কেউ সম্পত্তির ওপর সত্ত্ব দাবি করতে পারে না।
  • ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই চুক্তির ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করে না।

কারণ:

বায়না চুক্তির পরেও অবশিষ্ট অর্থ ও কবলা দলিল রেজিস্ট্রেশন বাকি থাকে।


৪. বায়না চুক্তি রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম

২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্দেশনাসমূহ:

  • বায়না চুক্তি রেজিস্ট্রেশন ৩০ দিনের মধ্যে করতে হবে।
  • রেজিস্ট্রেশন না হলে কোনো আইনি প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
  • রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ১৭ক ধারা অনুযায়ী উভয় পক্ষের স্বাক্ষর আবশ্যক

৫. বায়না চুক্তি বাতিলের পদ্ধতি

পক্ষগণ সম্মত হলে বায়না চুক্তি বাতিল করা সম্ভব।

  • উভয়পক্ষের সম্মতিতে একটি রহিতকরন দলিল সম্পাদন করতে হবে।
  • সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।

৬. দখল হস্তান্তরের নিয়ম

বায়না চুক্তি সম্পাদনের পর বিক্রেতা ক্রেতাকে দখল দিতে পারেন।

  • এজন্য সাফ বিক্রয় মূল্যায়নের উপর ৩% ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়।
  • যদি বায়না গ্রহীতা চুক্তির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হন, বিক্রেতা দখল ফেরত নিতে পারেন।

৭. শর্ত ভঙ্গের ফলে বায়না অর্থ ফেরতযোগ্য কিনা?

হ্যাঁ, শর্ত ভঙ্গের কারণে বায়না অর্থ ফেরতযোগ্য।

আইনানুসারে করণীয়:

  • বায়না গ্রহীতা আইনগত নোটিশের মাধ্যমে অর্থ ফেরত চাইতে পারেন।
  • ফেরত না পেলে তিন বছরের মধ্যে মানি স্যুট দায়ের করতে হবে।
  • তবে যদি চুক্তিতে অর্থ বাজেয়াপ্ত করার শর্ত থাকে, অর্থ ফেরতযোগ্য নয়।

৮. বায়না চুক্তি সংক্রান্ত মামলা

যদি বিক্রেতা কবলা দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে অস্বীকার করেন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে মামলা দায়ের করতে হবে।

শর্তাবলী:

  • বায়না দলিল লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে।
  • বায়না চুক্তির সময় উল্লেখ না থাকলে, ৬ মাসের মধ্যে কবলা দলিল সম্পাদন করতে হবে।

৯. বায়না চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকি

যদি বায়না দাতা সম্পত্তি অন্য কারো কাছে বিক্রি করেন, তা অবৈধ।

  • সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ৫৩(খ) ধারা অনুযায়ী এ ধরনের হস্তান্তর বাতিল হবে।

১০. বায়না চুক্তি পূর্বে ক্রেতার করণীয়

জমি ক্রয়ের পূর্বে ক্রেতার নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা উচিত:
১. সম্পত্তির সকল দলিল পরীক্ষা।
২. সম্পত্তি অন্য কোথাও বন্ধক বা বিক্রি হয়নি তা নিশ্চিত করা।
৩. এনওসি ও দায়মুক্তি সনদ সংগ্রহ।
৪. ভূমি সংক্রান্ত কোনো মামলা রয়েছে কিনা তা যাচাই।
৫. সঠিক দাগ ও খতিয়ান যাচাই।


১১. উপসংহার

বায়না চুক্তি সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি মালিকানা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। আইন অনুযায়ী বায়না দলিল রেজিস্ট্রেশন এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চুক্তির শর্তাবলী পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষগণ আইন মানলে ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।



জমি কেনার আগে আইনি পরামর্শ নিয়ে বায়না চুক্তি করুন, এটি ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।


আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।


প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন