বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ (The History and Evolution of the Judicial System in Bangladesh)



বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এর শেকড় প্রাচীন ভারতীয় সমাজের আইন-নীতি দ্বারা প্রভাবিত, যা হিন্দু আইন থেকে শুরু করে মুসলিম শাসন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পাকিস্তান আমলের বিচার কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে স্বাধীনতার পর, বাংলাদেশের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে, যা দেশের ন্যায়বিচার উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

 

প্রাচীন বিচার ব্যবস্থা

 বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রাচীন ইতিহাস মূলত হিন্দু ধর্মের নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল আদি ভারতীয় সমাজে "মনুসংহিতা" এবং অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ অনুসারে আইন তৈরি হতো এবং ব্রাহ্মণরা বিচার কার্য সম্পন্ন করতেন এই সময়ের বিচার ব্যবস্থা ছিল শ্রেণীভিত্তিক এবং সামাজিক স্তরের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে উচ্চ শ্রেণীর মানুষের বিচার পাওয়ার সুযোগ বেশি ছিল, আর সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া ছিল সীমিত

 

মুসলিম শাসনের বিচার ব্যবস্থা

 মুসলিম শাসনের অধীনে, বিশেষত দিল্লি সুলতান মুঘল আমলে, বাংলায় ইসলামী আইন চালু হয় এই সময়ে শারীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা কুরআন হাদিসের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হত কাজী নামে পরিচিত বিচারকরা শারীয়াহ আইন অনুসরণ করে বিচার কার্য সম্পন্ন করতেনমুঘল আমলে "ফতাওয়া--আলমগিরী" নামে একটি আইন সংকলন তৈরি করা হয়, যা শারীয়াহ আইনের ভিত্তিতে বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করত এই সময়ে কেন্দ্রীভূত বিচার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতের মাধ্যমে বিচার কার্য সম্পন্ন হতো, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য কার্যকর ছিল

 ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিচার ব্যবস্থা

 পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসন দখল করে এবং একটি নতুন বিচার ব্যবস্থা চালু করে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে বাংলা অঞ্চলে ইংরেজি কমন ' প্রবর্তন করা হয়১৮৬১ সালে ভারতীয় আদালত আইন প্রবর্তিত হয়, যা বাংলার বিচার ব্যবস্থার কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলে ব্রিটিশ শাসনকালে বিচার ব্যবস্থা আরও বেশি জোরালো হয় এবং ফৌজদারি দেওয়ানি বিচার পৃথক করা হয় এই বিচার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, যদিও সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগও বৃদ্ধি পায়

ব্রিটিশ আমলের আদালতের ছবি

পাকিস্তান আমলের বিচার ব্যবস্থা

 ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায় পাকিস্তান আমলে বিচার ব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে বিচার কার্য সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পরিচালিত হতো

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিচার ব্যবস্থা

 ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নতুন বিচার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্তসুপ্রিম কোর্ট এবং নিম্ন আদালত সুপ্রিম কোর্টের দুটি বিভাগ রয়েছেআপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগ আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগ প্রধানত সংবিধান, দেওয়ানি ফৌজদারি মামলার বিচার করেস্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে মামলার জট, বিচারক সংখ্যা কম হওয়া এবং বিচার কার্যের স্বচ্ছতার অভাব কিছু প্রধান সমস্যার মধ্যে অন্যতম তবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রসারে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চালু করা হয়েছে

 

বিচার ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ আধুনিকীকরণ

 বিচার বিভাগের অন্যতম বড় সমস্যা হল মামলার জট হাজার হাজার মামলা প্রতি বছর জমা হয়, যা বিচার কার্য সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় নেয় এছাড়া, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা দক্ষতার অভাব মানুষের আস্থা হ্রাস করতে পারেতবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিচার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং -জুডিশিয়ারি কার্যক্রম চালু হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার গতি বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার আরও সহজলভ্য করতে সাহায্য করছে

 

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

 বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যত উন্নতির জন্য আরও আধুনিকীকরণ সংস্কারের প্রয়োজন বিশেষত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, মামলা ব্যবস্থাপনা উন্নতি এবং বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে -জুডিশিয়ারি কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে মামলার জট কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার আরও সহজলভ্য করা সম্ভব হবে

নতুন প্রযুক্তি, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম, বিচার প্রক্রিয়ায় আরও গতি দক্ষতা নিয়ে আসতে পারে এছাড়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

 

উপসংহার

 বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা হাজার বছরের ইতিহাসের ফল হিন্দু, মুসলিম, ব্রিটিশ এবং স্বাধীন বাংলাদেশি প্রভাবের মিশেলে গঠিত এই বিচার ব্যবস্থা ক্রমবিকাশমান যদিও বিচার ব্যবস্থা আজও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তবে এর আধুনিকীকরণ এবং সংস্কারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব বিচার বিভাগের উন্নতির জন্য প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা


আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।


প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন