বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাস: স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে গণতন্ত্রের মজবুত ভিত্তি (History of the Constitution of Bangladesh: From the Dream of Independence to the Foundation of Democracy)

 


বাংলাদেশের সংবিধান শুধু একটি আইনি নথি নয়, বরং জাতির স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, এবং দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিফলন। এটি দেশের শাসনব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ বেয়ে জাতির আত্মপরিচয়ের শিকড়।  এই সংবিধান নানা পরিবর্তন ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক রূপ লাভ করেছে।


১. মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

১৯৭১ সালের নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার একটি 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র' জারি করে, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক নথি হিসেবে বিবেচিত। এই ঘোষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে এবং এতে রাষ্ট্রপতিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়। সংবিধানের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে এই ঘোষণাপত্র স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. সংবিধান প্রণয়ন কমিটির গঠন

স্বাধীনতা অর্জনের পর, ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় সংসদ একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এই ৩৪ সদস্যের কমিটি দেশের জন্য একটি স্বাধীন সংবিধান প্রণয়নে কাজ শুরু করে। জনগণের মতামত এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবিধান পর্যালোচনা করে, এই কমিটি এমন একটি সংবিধান রচনা করে, যা দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

  আরো পড়ুনঃ মুঘল আমলে অপরাধ ও শাস্তি: একটি বিশদ বিশ্লেষণ


৩. সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণ

সংবিধান প্রণয়ন কমিটি জনগণের মতামত সংগ্রহ করে এবং আন্তর্জাতিক সংবিধানের মডেল পর্যালোচনা করে একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করে। ১৯৭২ সালের ১২ই অক্টোবর, এই খসড়া জাতীয় সংসদে পেশ করা হয় এবং ৪ঠা নভেম্বর তা গৃহীত হয়। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর, বিজয় দিবসে এই সংবিধান কার্যকর হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. সংবিধানের মূলনীতি

বাংলাদেশের সংবিধান চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল:

  • গণতন্ত্র: জনগণের ইচ্ছা ও মতামতের ভিত্তিতে শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
  • সমাজতন্ত্র: অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা।
  • জাতীয়তাবাদ: বাঙালি জাতির ঐক্য ও স্বকীয়তার সংরক্ষণ।
  • ধর্মনিরপেক্ষতা: ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যবিহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

এই মূলনীতিগুলো দেশ গঠনের ভিত হিসেবে গণ্য হয় এবং দেশের আইনের সর্বোচ্চ নীতিমালা হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

৫. মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা

বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের জন্য মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে, যা রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের অধিকার এবং স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেয়। এতে সমানাধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা সংরক্ষিত রয়েছে। এসব অধিকার দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায় এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করে।

৬. রাষ্ট্র কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

বাংলাদেশের সংবিধান দেশকে একটি একক সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান হিসেবে কার্যরত থাকেন এবং তার নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে এবং সরকারের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭. সংবিধান সংশোধন: পরিবর্তনের ধারা

বাংলাদেশের সংবিধানকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করার ব্যবস্থা রয়েছে। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে কোনো ধারায় পরিবর্তন বা সংশোধন আনা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সংবিধানে বহুবার সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধনী হলো:

  • প্রথম সংশোধনী (১৯৭৩): যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫): রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।
  • পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১): ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল।
  • ষোড়শ সংশোধনী (২০১৮): সংসদ সদস্যদের অযোগ্য ঘোষণার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট থেকে সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনা।

৮. সংবিধানের চ্যালেঞ্জ ও প্রভাব

সংবিধান দেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। সামরিক শাসন, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, এবং মৌলিক অধিকার সীমিত করার ঘটনা সংবিধানের চেতনার বিরুদ্ধে গিয়েছে। তবে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। সংবিধান দেশের শাসন, আইনি প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি হিসেবে মজবুত অবস্থান ধরে রেখেছে।

উপসংহার: একটি জীবন্ত দলিল

বাংলাদেশের সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল, যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবিধানের মূলনীতি ও নির্দেশনা দেশের জাতীয় পরিচয় এবং গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।

বাংলাদেশের সংবিধান, তার ইতিহাস, এবং গঠনপ্রক্রিয়া জাতির জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থায়িত্বে এক মাইলফলক।


আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।


প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন