ভূমিকা
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। বিশেষত, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অধিকার ও পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু, দেশের বাস্তব চিত্র এ আইন ও নির্দেশনার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক। বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, অতিরিক্ত রিমান্ড এবং পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ প্রতিনিয়ত শোনা যায়। এই ব্লগে আমরা বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং রিমান্ডের আইনী কাঠামো, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
সংবিধানের নির্দেশনা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেফতার ও রিমান্ড সংক্রান্ত যে নির্দেশনা রয়েছে তা হলো:
১.গ্রেফতারের কারণ জানানোর বাধ্যবাধকতা:
কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ যথাসম্ভব দ্রুত জানাতে হবে।
২.আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের অধিকার:
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দিতে হবে।
৩.২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির:
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের আইনি কাঠামো
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ৫৪ ধারা এবং অন্যান্য ধারা বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশের ক্ষমতা নির্ধারণ করেছে। নিম্নে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের কিছু প্রধান শর্ত উল্লেখ করা হলো:
১.৫৪ ধারা অনুযায়ী:
কোনো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলে।
সন্দেহজনক অবস্থায় ঘুরাফেরা করলে।
সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাসস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।
২.৫৫ ধারা অনুযায়ী:
ভরণপোষণের জন্য কোনো প্রকাশ্য জীবিকা না থাকা ব্যক্তিদের গ্রেফতার।
৩.বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪:
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে।
রিমান্ড: আইন ও বাস্তবতা
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী:
তদন্ত শেষ না হলে এবং গ্রেফতারের কারণ বিশ্বাসযোগ্য হলে, পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন নিয়ে ২৪ ঘণ্টার পরেও হেফাজতে রাখতে পারে।
একটানা রিমান্ডের মেয়াদ ১৫ দিনের বেশি হতে পারে না।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা:
রিমান্ডের সময় ৩ দিনের বেশি হওয়া উচিত নয়।
জিজ্ঞাসাবাদ কারাগারের নির্ধারিত কক্ষে করতে হবে।
জিজ্ঞাসাবাদের আগে এবং পরে মেডিকেল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) বনাম রাষ্ট্র মামলায় উচ্চ আদালত ১৫টি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১.গ্রেফতারের কারণ লিপিবদ্ধ করা:
থানায় আনার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের কারণ জানাতে হবে।
২.আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের অধিকার:
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পছন্দের আইনজীবী বা নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দিতে হবে।
৩.জিজ্ঞাসাবাদে স্বচ্ছতা:
কাচঘেরা নির্ধারিত কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আইনজীবী বা আত্মীয় কক্ষের বাইরে উপস্থিত থাকতে পারবেন।
বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশে পুলিশি ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ড একটি সাধারণ ঘটনা।
১.বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার:
কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার দেখানোর পর বাস্তবে তাকে অন্য মামলায় জড়ানো হয়।
২.রিমান্ডে নির্যাতন:
অভিযোগ রয়েছে যে রিমান্ডে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
shown arrest-এর অপব্যবহার
শাউন অ্যারেস্ট একটি কৌশল যেখানে আসামিকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি আইনের অপব্যবহার এবং আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী।
করণীয়
১.আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা:
সংবিধান ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন।
২.স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:
পুলিশের গ্রেফতার ও রিমান্ড প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি।
৩.মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা:
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোতে তদন্ত ও সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
উপসংহার
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তবে, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের অপব্যবহার সেই অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সংবিধান ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমেই কেবল নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
