কারাগারের দেয়ালের ওপারে: নারী বন্দিদের নতুন জীবনের সুযোগ ও সংগ্রাম( Beyond the Prison Walls: The Opportunities and Struggles of a New Life for Female Prisoners)

 

বাংলাদেশে প্রতিদিন কেউ না কেউ শাস্তি পায়, কেউ না কেউ মুক্ত হয়। কিন্তু অনেক সময় মুক্তির চেয়ে বড় লড়াইটা শুরু হয় তখন, যখন কেউ তার শাস্তির মেয়াদ শেষ করে সমাজে ফিরে আসে।

বিশেষ করে যদি সে একজন নারী হয়।

নারীদের জন্য সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই একটু বেশি কঠিন। সে যখন অপরাধ করে বা শাস্তি পায়, তখন তার পরিচয়ের পাশে চিরস্থায়ীভাবে লেগে যায় "অপরাধী" তকমা। অথচ অপরাধ করে যারা শাস্তি ভোগ করেছে, তারা কি নতুন জীবনের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন: কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন, ২০০৬

একটি দ্বিতীয় সুযোগের কথা বলে এই আইন

এই আইনটি শুধু শাস্তি নয়, সংশোধনের ওপর জোর দেয়। একজন নারী বন্দি যদি তার সাজার অর্ধেক সময় শেষ করে ফেলে এবং সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—সে যেন আবার নিজের জীবনে ফিরে যেতে পারে, নিজের সন্তান, পরিবার, কিংবা সমাজের একজন সম্মানিত সদস্য হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই সুযোগ সবার জন্য নয়। ভয়ংকর অপরাধে জড়িত, যেমন রাষ্ট্রদ্রোহিতা, অস্ত্র বা মাদক মামলার দণ্ডিত নারীরা এই আইনের সুবিধা পান না। এতে বোঝা যায়—এই আইন অপরাধের ক্ষমা নয়, বরং সংশোধনের সুযোগ।

বন্দিদের জন্য হাতে-কলমে শিক্ষা

কারাগারে থাকা অবস্থায় নারী বন্দিদের জন্য থাকে নানা ধরনের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ: দর্জি কাজ, বিউটিফিকেশন, কম্পিউটার শিক্ষা, ওয়েব ডিজাইন, রন্ধনশিল্প সহ আরও অনেক কিছু। লক্ষ্য একটাই—কারাগারের বাইরে গিয়ে তারা যেন উপার্জনের একটি রাস্তা খুঁজে পায়।

কিন্তু শুধু প্রশিক্ষণই কি যথেষ্ট?

পুনর্বাসনের চেয়ে বড় যুদ্ধ হলো গ্রহণযোগ্যতা

আইনের খুঁটিনাটি পড়লে বোঝা যায়, নারীদের জন্য “আফটার কেয়ার” সেবা আছে। অর্থনৈতিক সহায়তা, পুনর্বাসন সহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ঠিক ততটা উজ্জ্বল নয়।

অনেক নারী সাজা শেষে মুক্ত হলেও সমাজ, পরিবার এমনকি আত্মীয়স্বজনের কাছেও তারা যেন একেবারে অচেনা হয়ে যান। তাদের জীবনটা তখন আরেকটা নতুন শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি শুধু আইন করে দায়িত্ব শেষ করতে পারি? না কি সমাজের মানসিকতা বদলানোও জরুরি?

আমাদের করণীয় কী?

এই আইনটি বাস্তবায়নে যেমন সরকারের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদের—সাধারণ নাগরিক, সমাজ, পরিবার—সবাইকে আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে।

একজন নারী যদি তার ভুলের জন্য শাস্তি ভোগ করে থাকে এবং আবার নতুন করে জীবন গড়তে চায়, তবে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সে হতে পারে আপনার সহকর্মী, গৃহকর্মী, দোকানদার বা একজন উদ্যোক্তা। আমাদের উচিত হবে, অপরাধী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে তাকে দেখা।

কারণ, জীবনে একবার ভুল করলেই কেউ চিরদিনের জন্য খারাপ হয়ে যায় না।


সমাপ্তি কথা:

“কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন, ২০০৬” কাগজে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এটি যেন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটাই চ্যালেঞ্জ। এই আইনের মাধ্যমে আমরা যদি একটি নারীকে সমাজে ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে সেটাই হবে মানবিকতার সবচেয়ে বড় জয়।


আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।

আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।

ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।

প্রসেনজিৎ দাস

এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন