বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুতর সমস্যাগুলোর একটি হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে ও মাপে কারচুপি। অনেক ব্যবসায়ী অল্প সময়েই বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য ওজনে কম দিয়ে বা মিথ্যা মাপে পণ্য বিক্রি করছেন, যা শুধু একটি অনৈতিক কাজ নয়, বরং আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন অর্থনৈতিকভাবে, আবার এর ফলে সমাজে অবিশ্বাস ও অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানুষ যখন ন্যায্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা পায় না, তখন ব্যবসায়িক পরিবেশও ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
আইন অনুযায়ী ওজনে কম দেওয়ার অপরাধ এবং শাস্তি
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০
দণ্ডবিধির ২৬৪ ধারা:
যদি কেউ প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা ওজনের যন্ত্র ব্যবহার করেন, তাহলে তিনি এক বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
দণ্ডবিধির ২৬৫ ধারা:
মিথ্যা ওজন বা মাপ প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে, একইভাবে এক বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
দণ্ডবিধির ২৬৬ ধারা:
যদি কেউ মিথ্যা ওজন বা মাপের যন্ত্র জানার পরও প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তার বিরুদ্ধেও এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য।
ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ
ক্রেতা হিসেবে যদি আপনি ওজনে ঠকেন, তাহলে আপনি নিকটস্থ মুখ্য মহানগর হাকিম বা মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন।
মামলা দায়েরের পর, আদালত অভিযোগ শুনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিতে পারেন।
যদি তিনি হাজির না হন, তাহলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী প্রতিকার
এছাড়াও, আপনি ভোক্তা হিসেবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিকট অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
ধারা ৭৬ (১) অনুযায়ী:
যেকোনো ভোক্তা লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির নিকট।
ধারা ৪৬: ওজনে কারচুপির শাস্তি
যদি কেউ প্রতিশ্রুত ওজনের চেয়ে কম ওজনের পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ধারা ৪৭: ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি
যদি ওজন মাপার যন্ত্র ভুল ওজন দেখায় এবং তা ব্যবহৃত হয় পণ্য বিক্রিতে, তাহলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য।
ধারা ৪৮: পরিমাপে কারচুপির শাস্তি
কম পরিমাপে পণ্য বিক্রি করলেও একইভাবে এক বছর কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: ন্যায্যতার প্রশ্ন
একজন সাধারণ ক্রেতার জন্য প্রতিদিনের বাজারে সঠিক ওজনে পণ্য পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার। যখন কেউ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তখন সেটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—মানসিক কষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, ব্যবসার মূল ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাস তখনই গড়ে উঠে, যখন বিক্রেতা সততা ও ন্যায্যতা বজায় রাখেন। অতএব, স্বল্প লাভে সন্তুষ্ট থাকা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করাই দীর্ঘমেয়াদে সফলতা ও সম্মানের পথ।
আপনার করণীয়
ওজনে সন্দেহ হলে পণ্যের ওজন দোকানে মেপে নিন অথবা কাছাকাছি সরকারি ওজনযন্ত্রে যাচাই করুন।
ওজনে কম পেলে প্রমাণসহ অভিযোগ করুন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে।
প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নিতে ভয়ের কিছু নেই—এটি আপনার অধিকার।
উপসংহার
ওজন বা পরিমাপে কম দেওয়ার মতো প্রতারণামূলক কাজ শুধু আইনভঙ্গ নয়, এটি একটি নৈতিক অধঃপতনের প্রতিচ্ছবি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু একজন ভোক্তাকে ঠকায় না, বরং সমাজের সার্বিক আস্থা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়। আইনের চোখে এই অপরাধের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা, যা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারলে সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। একজন ক্রেতা হিসেবে আমাদের যেমন অধিকার আছে প্রতিকার পাওয়ার, তেমনি রয়েছে সচেতন হওয়ার দায়িত্ব। আর একজন বিক্রেতার উচিত, সততা ও মানবিকতা বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা।
সবার সম্মিলিত চেষ্টায়ই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায্য, বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক বাজার ব্যবস্থা—যেখানে প্রতারণা নয়, বরং আস্থা ও সুবিচার হবে মূল চালিকা শক্তি।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

.jpg)