পুলিশি তল্লাশী ও আটকে নাগরিক অধিকার


ভাবুন তো, সকালে অফিস যাচ্ছেন  হঠাৎ রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে থামালো, ব্যাগ খুলে দেখতে চাইল, ফোনে কী আছে তাও জানতে চাইল।এই সময় অনেকেই ভয় পেয়ে যান, কেউ আবার বিরক্ত হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো  পুলিশের এমন তল্লাশি কি আইনসম্মত? আর নাগরিক হিসেবে আপনার অধিকারই বা কী?

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সারাদেশেই নিরাপত্তা ব্যাবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হচ্ছে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। চলছে পথচারী, যানবাহন, এমনকি বাড়িঘর পর্যন্ত তল্লাশি অভিযান।এই অবস্থায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কারণ সবাই জানেন না  আইন এ বিষয়ে কী বলে।আসলে বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১০১, ১০২ ও ১০৩ ধারায় পুলিশের তল্লাশি ও নাগরিকের অধিকার নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।আইন অনুযায়ী, পুলিশ ইচ্ছে করলেই যেকোনো সময়, যেকোনো ব্যক্তিকে তল্লাশি করতে পারেন না। তল্লাশির আগে তাদের কিছু প্রক্রিয়া মেনে চলতে হয়। যেমনঃতল্লাশি শুরুর আগে পুলিশকে নিজের পরিচয় ও থানা জানাতে হয়,স্থানীয় এলাকার দুইজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে ডেকে নিতে হয়,তল্লাশি শেষে জব্দকৃত মালামালের তালিকা করতে হয় এবং সেই তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিতে হয়।যদি কোনো অবৈধ বস্তু না পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশকে লিখিতভাবে“কিছু পাওয়া যায়নি” বলে উল্লেখ করতে হয়।

এগুলো শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এগুলোই নাগরিকের নিরাপত্তার গ্যারান্টি।কখনও কখনও পুলিশের সন্দেহ হতে পারে যে কারও দেহে অবৈধ কিছু লুকানো আছে। তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩(৪) ধারায় বলা আছে, পুলিশ দেহ তল্লাশি করতে পারে।তবে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মহিলা হন, তাহলে ধারা ৫২ অনুসারে সেই তল্লাশি অবশ্যই মহিলা পুলিশ বা স্থানীয় কোনো মহিলা দিয়ে, এবং শালীনতার সাথে করতে হবে।এই আইন লঙ্ঘন করলে তা অবৈধ গণ্য হবে।সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে — আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেকের মোবাইল ফোন, ম্যাসেজ, হোয়াটসঅ্যাপ বা কললিস্ট পর্যন্ত পরীক্ষা করছে।কিন্তু সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ বলছে“প্রত্যেক নাগরিকের চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতা রক্ষার অধিকার থাকবে।”অর্থাৎ, আদালতের আদেশ ছাড়া বা সুনির্দিষ্ট যুক্তি ছাড়া কারও ফোন তল্লাশি করা যায় না।এটি একজন ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মর্যাদার অধিকার লঙ্ঘন।

এখন প্রশ্ন আসে — পুলিশ কবে বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে?ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা বলছে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে — যেমন পলাতক আসামি, ঘোষিত অপরাধী, বা কারও কাছে চোরাই মালামাল আছে বলে সন্দেহ হলে — পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের ওয়ারেন্ট ছাড়াও গ্রেপ্তার করতে পারে।কিন্তু এর ক্ষেত্রেও আছে কিছু বাধ্যবাধকতা যেমন।গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশকে নিজের পরিচয় জানাতে হবে,গ্রেপ্তারের কারণ স্পষ্ট করে বলতে হবে,এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামীকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।কোনো অবস্থায় শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না।এমন পরিস্থিতিতে নাগরিক হিসেবেও কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি রাখা উচিত –যেমন সবসময় নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পেশাগত পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় শান্ত ও ভদ্র আচরণ করুন।তল্লাশির সময় যথা সম্ভব সহায়তা করুন।যদি পুলিশ কিছু জব্দ করে, তাহলে জব্দকৃত দ্রব্যের তালিকার কপি চেয়ে নিন এবং সবশেষে   কখনো কোনো সাদা কাগজে স্বাক্ষর করবেন না।যদি আপনি মনে করেন, আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, পুলিশ সুপার, বা প্রয়োজনে হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন।

মনে রাখবেন পুলিশ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী — আর নাগরিকই  হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রাণ।

সাধারন জনগন এবং পুলিশ দুই পক্ষেরই দায়িত্ব আছে  একদিকে আইন মেনে দায়িত্ব পালন করা, অন্যদিকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা।মনে রাখবেন  তল্লাশি বা আটক মানেই অপরাধ নয়। কিন্তু আইন যদি লঙ্ঘন হয়, তাহলে প্রতিটি নাগরিকেরই আছে  নিজের অধিকার রক্ষার অধিকার। —

“ ভয় নয়, আপনার আইন সম্পর্কে সচেতনতা-ই আপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।”




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন