মানুষের জীবন কখনো শুধু লেনদেনের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আত্মীয়তা, মমতা আর বিশ্বাস—এইসব মানবিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কখনো কখনো কেউ তার অর্জিত সম্পদ আরেকজনের হাতে তুলে দেন বিনিময়হীনভাবে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও নিঃস্বার্থ হস্তান্তরের নামই হলো হেবা বা দান।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিশেষত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী, হেবা একটি বৈধ ও স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের মাধ্যম। কিন্তু এই মানবিক কার্যক্রমটি বাস্তব জীবনে আইনগত প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই সম্পন্ন হতে হয়—না হলে তা হতে পারে জটিলতার উৎস।
এই লেখায় আমরা মানবিক আবেগ ও আইনি কাঠামোর সংমিশ্রণে হেবা বা দানের প্রকৃতি, শর্ত, বৈধতা, সীমাবদ্ধতা ও বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি সহজ ভাষায় তুলে ধরবো।
হেবা বা দানের সংজ্ঞা ও আইনগত ভিত্তি
‘হেবা’ শব্দটির অর্থই হলো—স্বেচ্ছায় সম্পত্তি হস্তান্তর। এতে কোনো বিনিময় নেই, নেই কোনো মূল্য পরিশোধ। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ থেকে ১২৯ ধারা পর্যন্ত হেবা বা দানের আইনগত দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
হেবার জন্য প্রয়োজন হয় মৌখিক বা লিখিত ঘোষণার মাধ্যমে মালিকানার স্থানান্তর। মুসলিম আইন অনুযায়ী মৌখিক হেবা বৈধ হলেও স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে বর্তমানে লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত দলিল আবশ্যক, যা কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে।
কাদের মাঝে হেবা বৈধভাবে করা যায়?
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৭৮ক(খ) অনুযায়ী, নিচের আত্মীয়দের মধ্যে হেবা করা যাবে:
-
স্বামী ও স্ত্রী
-
পিতা-মাতা ও সন্তান
-
দাদা-দাদী/নানা-নানী ও নাতি-নাতনী
-
সহোদর ভাই-বোন
এই পারিবারিক গণ্ডির বাইরে হেবা করতে হলে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশনসহ পূর্ণাঙ্গ দলিল সম্পাদন করতে হবে।
হেবা বা দানের মূল শর্তসমূহ (মুসলিম আইন)
একটি হেবা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নিচের তিনটি শর্ত একযোগে পূরণ হয়:
১. দান ঘোষণার ইচ্ছা দাতার পক্ষ থেকে প্রকাশ পায়।
২. দান গ্রহণ করতে হবে গ্রহীতার পক্ষ থেকে, স্পষ্ট বা পরোক্ষভাবে।
৩. দখল হস্তান্তর করতে হবে দানের বস্তুটির উপর।
যদিও দখল হস্তান্তর মুসলিম আইনে অত্যাবশ্যক, তবে বর্তমান সময়ে রেজিস্ট্রেশনকেই দখল হস্তান্তরের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়—বিশেষত যখন রেজিস্ট্রি দলিলে দাতার স্বত্ব পরিত্যাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।
দানপত্র দলিল কখন বিক্রয় দলিলে পরিণত হয়?
যদি হেবার পেছনে থাকে লেনদেন, দেনা পরিশোধ বা কোনো প্রতিদান—তাহলে সেটি আর নিঃস্বার্থ দান থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে আদালত দানপত্রকে কবলা দলিল বা বিক্রয় দলিল হিসেবে বিবেচনা করে।
উদাহরণ:
-
দেনা শোধের উদ্দেশ্যে দান – এটি বিক্রয় হিসেবে গণ্য (AIR 1951 All 86)।
-
স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধে হেবা – অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিক্রয় হিসেবে ধরা হয় (23 BLT (AD) 111)।
এইসব ক্ষেত্রে খতিয়ানের সহ-স্বত্বাধিকারীরা অগ্রক্রয়ের মামলা দায়ের করতে পারেন।
দানপত্র রেজিস্ট্রেশন না হলে কী হয়?
দাতা যদি কেবল মৌখিকভাবে দান করেন কিন্তু রেজিস্ট্রেশন না করেন, এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার উত্তরাধিকারীরা সেই হেবা বৈধ করতে পারেন যদি তারা পরবর্তীতে রেজিস্ট্রেশন করে। এ ক্ষেত্রে হেবার পূর্ণতা দাতার জীবদ্দশায় ঘোষণার মাধ্যমেই ঘটে গেছে বলে ধরা হয়।
তবে যদি দানগ্রহীতা দান গ্রহণের আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে সেই হেবা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে।
হিন্দুদের ক্ষেত্রে হেবা: দখলের প্রয়োজনীয়তা
পূর্বে হিন্দুদের ক্ষেত্রে হেবা বা দানের জন্য দখল হস্তান্তর আবশ্যক ছিল। তবে ২০০৪ সালে সংশোধিত আইনের মাধ্যমে (১২৩ ধারা) এখন শুধু রেজিস্ট্রেশনই যথেষ্ট।
হাইকোর্টের মতে, (23 BLC 771) রেজিস্ট্রিকৃত দলিলই হস্তান্তরের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচ্য।
হেবা বা দান কি শর্ত সাপেক্ষে বাতিলযোগ্য?
মুসলিম আইন অনুযায়ী শর্তযুক্ত হেবা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২৬ ও ৩১ ধারায় কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে:
-
যদি দাতা ও গ্রহীতা পূর্বেই সম্মত হন যে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে দান প্রত্যাহারযোগ্য, তবে সেটি বৈধভাবে বাতিলযোগ্য।
-
প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, বা চুক্তি ভঙ্গের ভিত্তিতে দান প্রত্যাহার করা যায়।
তবে এর সবই নির্ভর করে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল এবং তার শর্তাবলির উপর।
নাবালকের পক্ষে দান গ্রহণ: আইন কী বলে?
একজন নাবালকের পক্ষ থেকে তার পিতা বা মাতা হেবা গ্রহণ করলে সেটি আইনি বৈধতা পায়।
(AIR 2004 P&H 257) অনুযায়ী, এমন দান বাতিলযোগ্য নয়, বরং কার্যকর হস্তান্তর হিসেবে গণ্য।
উপসংহার
হেবা বা দান, তার প্রকৃত রূপে, একটি মানবিক ও আন্তরিক কার্যক্রম। কিন্তু এই আত্মিক কর্মটি আইনের নির্ধারিত পথে না চললে তার সৌন্দর্য ধুলোয় মিশে যেতে পারে। আজকের প্রেক্ষাপটে, যেখানে সম্পত্তির প্রতিটি ইঞ্চির জন্য বিচার চাইতে হয় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে, সেখানে আইন মেনে হেবা করা শুধুই সচেতনতা নয়—এটি একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য।
সঠিক রেজিস্ট্রেশন, প্রমাণিত গ্রহণ, এবং পারস্পরিক সম্মতিতে হেবা সম্পাদনই পারে ভালোবাসার এই স্বাক্ষরকে স্থায়ী, নির্ভরযোগ্য ও বিরোধমুক্ত রাখতে।
