বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ (Mental Health Act, 2018) একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার, চিকিৎসা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে উন্নত করার লক্ষ্যে প্রণীত। এ আইন শুধু রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার কথা বলে না, বরং তাদের মানবাধিকার সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
১। আইনের প্রাধান্য
মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক রোগীদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য:
- মানসিক রোগীদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য কমানো।
- মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।
- রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা ও সুরক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।
- মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা।
২। মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তির অধিকার
আইনটি মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিম্নলিখিত অধিকারগুলো নিশ্চিত করে:
২.১। চিকিৎসার অধিকার
- সকল মানসিক রোগী তাদের অবস্থা অনুযায়ী বিনামূল্যে বা নির্ধারিত খরচে চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার রাখেন।
- রোগীদের সম্মান এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।
২.২। সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার
- মানসিক রোগীদের নিজস্ব চিকিৎসা সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে।
- জোরপূর্বক কোনো চিকিৎসা দেওয়া যাবে না, যদি না তা রোগীর জীবন বা অন্যের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য হয়।
২.৩। মানবিক আচরণের অধিকার
- মানসিক রোগীদের প্রতি অসম্মানজনক বা অমানবিক আচরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩। মানসিক হাসপাতাল স্থাপন
মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মানসিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য কিছু নির্ধারিত নীতি ও শর্ত রয়েছে:
৩.১। অনুমোদন প্রক্রিয়া
- মানসিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য সরকার থেকে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
- হাসপাতালের পরিবেশ, চিকিৎসার মান এবং কর্মীদের যোগ্যতা যাচাই করে অনুমোদন প্রদান করা হয়।
৩.২। বিশেষায়িত সেবা
- হাসপাতালগুলোতে মানসিক রোগীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা ও পরিকাঠামো থাকতে হবে।
৪। মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শন, তল্লাশি ও জব্দ
আইনের আওতায় মানসিক হাসপাতালগুলোতে সরকারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিদর্শন করতে পারেন।
৪.১। তদারকি ও মূল্যায়ন
- হাসপাতালের পরিষেবার মান বজায় রাখা এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়।
৪.২। অনিয়ম সনাক্তকরণ
- অনিয়ম ধরা পড়লে সরকার জরিমানা, শাস্তি বা হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করতে পারে।
৫। জরিমানা আরোপের ক্ষমতা
মানসিক স্বাস্থ্য আইন অনুযায়ী, এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে সরকার নিম্নলিখিত জরিমানা আরোপ করতে পারে:
৫.১। ব্যক্তিগত জরিমানা
- অননুমোদিত চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
৫.২। প্রতিষ্ঠানের জরিমানা
- কোনো হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান নিয়ম লঙ্ঘন করলে তাদের কার্যক্রম স্থগিত এবং অর্থদণ্ড আরোপ করা যেতে পারে।
৬। ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত মানসিক রোগী
ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কোনো মানসিক রোগীকে আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে বিশেষ চিকিৎসা প্রদান করা যেতে পারে।
৬.১। মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন
- রোগীর মানসিক অবস্থার বিশেষ মূল্যায়ন করা হয়।
- যদি রোগী মানসিকভাবে অস্বাভাবিক প্রমাণিত হন, তবে তাকে সংশোধনাগারের পরিবর্তে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
৬.২। চিকিৎসা চলাকালীন সুরক্ষা
- অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
৭। মানসিক রোগী ভর্তি প্রক্রিয়া
মানসিক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য আইন বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে:
৭.১। স্বেচ্ছায় ভর্তি
- রোগী স্বেচ্ছায় ভর্তি হতে চাইলে তাকে কোনো প্রকার বাধা দেওয়া যাবে না।
৭.২। জোরপূর্বক ভর্তি
- রোগীর মানসিক অবস্থা গুরুতর হলে এবং সে নিজের বা অন্যদের জন্য ক্ষতিকর হলে, চিকিৎসকের সুপারিশে তাকে ভর্তি করা যেতে পারে।
৮। মানসিক রোগীদের চিকিৎসার অধিকার
আইন অনুযায়ী, মানসিক রোগীদের চিকিৎসার অধিকার সম্পর্কে বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে:
৮.১। বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা
- প্রতিটি মানসিক রোগীর জন্য পৃথক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
৮.২। পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
- রোগীদের পুনর্বাসনে পরিবার এবং সমাজের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
৯। মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮-এর গুরুত্ব
এই আইনটি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান কুসংস্কার ও অবহেলা দূর করার পাশাপাশি রোগীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে।
উপসংহার:
মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ শুধু একটি আইন নয়, এটি এক মানবিক প্রচেষ্টা যা মানসিক রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা ও সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে। এটি শুধু চিকিৎসার অধিকারই নয়, বরং একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
