ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় আসামির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি আসামি পলাতক থাকেন, বিদেশে অবস্থান করেন, অথবা মামলা সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে কীভাবে বিচার পরিচালিত হবে? ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯(খ) ধারা অনুযায়ী, আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। চলুন, এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
১. পলাতক আসামির বিচার: আইন কী বলে?
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯(খ) ধারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, আদালত যদি আসামিকে উপস্থিত করার যথাযথ প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়, তাহলে তার অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু হতে পারে। তবে এর আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
২. আসামিকে আদালতে হাজির করতে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ
২.১. বিশেষ ঘোষণা (ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৭ ধারা)
- আদালত প্রথমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করবে।
- যদি দেখা যায় যে আসামি লুকিয়ে আছেন বা গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাহলে ৮৭ ধারার অধীনে একটি লিখিত ঘোষণা প্রকাশ করা হবে।
- এতে আসামিকে ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।
- এই ঘোষণা আসামির আবাসস্থল, স্থানীয় থানার নোটিশ বোর্ড এবং আদালত প্রাঙ্গণে টাঙিয়ে দেওয়া হবে।
২.২. সম্পত্তি ক্রোক (৮৮ ধারা)
- ৮৭ ধারার আদেশ জারির পরেও যদি আসামি হাজির না হন, তাহলে আদালত ৮৮ ধারার অধীনে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন।
- এটি আসামির উপর আইনি ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে, যাতে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।
২.৩. সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
- এতকিছুর পরেও যদি আসামি আত্মগোপন করে থাকেন, তাহলে আদালত দুটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারেন।
- এতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আসামিকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।
৩. অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন হলে কী হবে?
- যদি উপরের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও আসামি আদালতে না আসেন, তাহলে বিচারকাজ তার অনুপস্থিতিতেই শুরু হয়।
- এ অবস্থায় আসামির নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ কমে যায় এবং আদালত একতরফা রায় ঘোষণা করতে পারেন।
- অধিকাংশ ক্ষেত্রে, অনুপস্থিত আসামির বিরুদ্ধে সাজা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৪. পলাতক আসামির অধিকার ও আপিল করার সুযোগ
৪.১. বিচার শুরু হওয়ার আগে আদালতে আত্মসমর্পণ
- যদি আসামি বিচার শুরুর আগেই আদালতে আত্মসমর্পণ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী আদেশগুলো বাতিল হতে পারে।
- তিনি জামিনের আবেদন করতে পারেন এবং যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।
৪.২. আপিল করার সুযোগ
- যদি আসামি দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হন বা আত্মসমর্পণ করেন, তাহলেও তার উচ্চ আদালতে আপিল করার অধিকার থাকে।
- এ অবস্থায় তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন এবং আদালত তার জামিন ও শাস্তি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
- তবে আপিল প্রক্রিয়া সহজ নয়, এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।
৫. ন্যায়বিচার ও আইনের সুস্পষ্ট অবস্থান
আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই আসামি যদি আত্মগোপনে থাকেন, তবে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু তার অধিকার পুরোপুরি নষ্ট হয় না। সে চাইলে পরবর্তীতে আপিল করে সুবিচারের দাবি করতে পারেন। তবে পলাতক থাকার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় আদালতে হাজির হওয়াই আইনগতভাবে এবং নৈতিকভাবে উত্তম পথ।
শেষ কথা
ফৌজদারি মামলায় আসামির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পলাতক থাকলে বিচার থেমে থাকে না। আদালত আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসামিকে উপস্থিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হলে অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। তবে আসামির অধিকার বজায় থাকে, এবং তিনি চাইলে আপিল করে ন্যায়বিচার পেতে পারেন। তাই আইন মেনে চলা এবং আদালতে স্বেচ্ছায় হাজির হওয়া সর্বোত্তম পথ।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
