দেনমোহর—কী এবং কেন?
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, দেনমোহর হচ্ছে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর প্রতি একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব। যা স্ত্রীর কাছে স্বামীর জামানতবিহীন ঋণ, যা বিয়ের সময়েই নির্ধারণ করতে হয়। অনেকে ভুলভাবে মনে করেন, তালাক হলে তবেই দেনমোহর দিতে হয়। বাস্তবতা হলো, তালাক হোক বা না হোক, স্ত্রী দেনমোহর দাবি করতে পারবেন এবং স্বামী তা দিতে বাধ্য।
দেনমোহরের দুই রূপ: মুয়াজ্জল ও মুঅজ্জল
শরিয়াহ মতে দেনমোহর দুই ধরনের হয়:
মুয়াজ্জল (তাৎক্ষণিক) — যেটি স্ত্রী যেকোনো সময় দাবি করলে স্বামীকে সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে।
মুঅজ্জল (বিলম্বিত) — যা তালাক বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী দাবি করতে পারেন।
অভ্যস্ত সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে অনেক পরিবারই এই দুটি ধরণের পার্থক্য বোঝেন না। ফলে দেনমোহরকে অবহেলা করা হয় বা বিবাহের পর আর কেউ তা মনে রাখেন না—যা নারী অধিকারের এক ধরনের অবমূল্যায়ন।
দেনমোহর নির্ধারণের বাস্তবতা
একটি বড় প্রশ্ন আসে—দেনমোহরের পরিমাণ কত হবে? ইসলামে বলা হয়েছে, ন্যূনতম পরিমাণ ১০ দিরহাম, অর্থাৎ প্রায় ২৩০ টাকা। তবে সর্বোচ্চ পরিমাণে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। দেনমোহর নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয় মেয়ের পরিবারের ঐতিহ্য, অন্যান্য মহিলা আত্মীয়ের দেনমোহর, আর স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— দেনমোহর যেন প্রথার কারণে নির্ধারিত না হয়ে, বরং সম্মান ও দায়িত্ববোধ থেকে নির্ধারিত হয়।
সোনা, জমি, উপহার—দেনমোহর হিসেবে গণ্য হয় কি?
অনেকে বিয়ের সময় স্ত্রীকে সোনা, জমি বা উপহার দেন এবং ভাবেন এটিই দেনমোহর। কিন্তু যদি লিখিতভাবে কাবিননামায় “দেনমোহর বাবদ” বলে উল্লেখ না থাকে, তাহলে এগুলো দেনমোহর হিসেবে বিবেচিত হবে না। তাই প্রতিটি দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে দলিলে উল্লেখ থাকা জরুরি।
দেনমোহর না পেলে করণীয় কী?
অনেক নারী দেনমোহরের দাবি করেও তা পান না। এমনকি কখনো কখনো সম্মান রক্ষার্থে চুপ থাকেন। কিন্তু ইসলামী আইন এবং বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর আদায় নারীর পূর্ণ অধিকার। স্বামী যদি তা পরিশোধ না করেন, তাহলে স্ত্রী সংসার ছাড়তে পারেন এবং আদালতে মামলা করতে পারেন। এমনকি স্বামী যদি পরে স্ত্রীর বিরুদ্ধে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মামলা করেন, তাও খারিজ হতে পারে।
ওজনে কম দেওয়ার প্রতারণা: একটি সমাজিক ব্যাধি ও এর আইনি প্রতিকার
মৃত্যুর পর দেনমোহরের দাবি
স্বামী মারা গেলে এবং দেনমোহর পরিশোধ না থাকলে, স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তি থেকে তা দাবি করতে পারেন। আর যদি স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন এবং দেনমোহর বাকি থাকে, তাহলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারগণ স্বামীর নিকট থেকে তা দাবি করতে পারেন। এই অধিকার অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
নারীর সম্মান ও দেনমোহর: একটি মানবিক দৃষ্টিকোণ
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে যে জায়গায় নিয়ে গেছে, তা অনেক সভ্যতাই দিতে পারেনি। দেনমোহর তার একটি সুন্দর নিদর্শন। এটি শুধু অর্থ নয়—দেনমোহর স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর সম্মানে একটি প্রতিশ্রুতি, যা তার স্বাধীনতা ও মর্যাদার স্বীকৃতি। একজন নারী যেন জানেন—তিনি কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়, তার নিজেরও অধিকার আছে এবং সে অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করাই একটি সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের পরিচয়।
শেষ কথা
দেনমোহর শুধু একটি প্রথা নয়, এটি নারীর এক শক্তিশালী অধিকার। সমাজে এই চর্চাটি যথাযথভাবে মানা হলে, নারীরা নিজেদের আরও বেশি সম্মানিত ও সুরক্ষিত মনে করবেন। তাই আসুন, দেনমোহরকে শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান না বানিয়ে একে সম্মান, দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি।
আমাদের এই আইন ব্লগের মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে তথ্যসমৃদ্ধ ও সহায়ক কনটেন্ট পৌঁছে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রশ্ন, মতামত বা পরামর্শ থাকলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আপনারা আমাদের আর্টিকেলগুলো কেমন পাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে কী ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা দেখতে চান, সে সম্পর্কেও আপনার মতামত শেয়ার করতে পারেন।
আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমাদের ব্লগটি শেয়ার করে আরও মানুষকে আইনি জ্ঞান লাভে সহায়তা করবেন।
ধন্যবাদ, এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা।
প্রসেনজিৎ দাস
এল.এল .বি, এল, এল, এম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

