প্রতিদিনই আমাদের আশেপাশে ছোট-বড় নানা ধরণের বিরোধ দেখা যায়—সম্পত্তি নিয়ে, পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে, অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে। এসব বিরোধ যখন নিজেদের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব হয় না, তখন একমাত্র আশ্রয় হয় আদালত। আর এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে যে মামলা হয়, সেগুলোই মূলত দেওয়ানি মামলা নামে পরিচিত।
১। দেওয়ানি মামলার প্রকারভেদ
দেওয়ানি মামলা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। নিচে কয়েকটি প্রধান ধরন তুলে ধরা হলো—
পারিবারিক মামলা: দেনমোহর, ভরণপোষণ, তালাক, সন্তানের হেফাজত, উত্তরাধিকার, দত্তক ইত্যাদি।
চুক্তিভিত্তিক মামলা: টাকা আদায়ের মামলা, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মামলা।সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা: মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ, নামজারি/নাম খারিজ, দলিল সংশোধন বা বাতিলকরণ ইত্যাদি।
নিষেধাজ্ঞা ও অস্থায়ী প্রতিকার সংক্রান্ত মামলা।
২। কোথায় এবং কিভাবে দেওয়ানি মামলা দায়ের করবেন?
দেওয়ানি মামলা দায়ের করার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত আদালত নির্ধারণ। যেমন:
পারিবারিক বিরোধের মামলার জন্য → পারিবারিক আদালত।
সম্পত্তি সংক্রান্ত সাধারণ মামলা → সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালত।বাদী আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে একটি আরজি দাখিল করে মামলা শুরু করেন। বিবাদী তখন লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং পরে আদালত শুনানির মাধ্যমে রায় প্রদান করেন।
৩। আরজিতে যা যা থাকতে হবে
আরজি হল মূল অভিযোগের লিখিত বিবরণ। এতে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক—
১। আদালতের নাম
২। বাদী ও বিবাদীর নাম, পরিচয় ও ঠিকানা
৩। মানসিক বা বয়সগত অযোগ্যতা থাকলে তার উল্লেখ
৪। আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কিত বিবৃতি
৫। ঘটনার ক্রমবিন্যাস ও মামলার মূল কারণ
৬। বাদীর চাওয়া প্রতিকার
৭। দাবির কোনো অংশ পরিত্যাগ করা হলে তার বিবরণ
৮। মামলা ও দাবির মূল্য এবং কোর্ট ফি সম্পর্কিত তথ্য
৯। প্রতিনিধিত্বমূলক মামলা হলে তার ব্যাখ্যা
১০। আর্থিক দাবির পরিমাণ (যদি থাকে)
১১। অস্থাবর/স্থাবর সম্পত্তির যথাযথ বিবরণ
১২। সময়গত সীমা অতিক্রমের ব্যাখ্যা (যদি থাকে)
১৩। বাদীর স্বাক্ষর ও তারিখ
৪। মামলা দায়েরের প্রাথমিক ধাপসমূহ
আরজি দাখিল: বাদী নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে দাখিল করেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল: ওকালতনামা, দলিলাদি, কোর্ট ফি, প্রসেস ফি ইত্যাদি।সঠিক কোর্ট ফি না দিলে: আদালতের নির্দেশে ৭ দিনের মধ্যে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়।
সঠিক দাখিলের পর: সেরেস্তাদার মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।
৫। পরবর্তী ধাপসমূহ
১। সমন জারি: বিবাদীকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ
২। জবাব দাখিল: বিবাদী ২ মাসের মধ্যে লিখিত জবাব দেন
৩। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): আদালতের মধ্যস্থতায় আপসের চেষ্টা
৪। ইস্যু গঠন: বিরোধীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করে শুনানির প্রস্তুতি
৫। উদ্ঘাটন ও পরিদর্শন: এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রশ্ন করতে পারে
৬। ৩০ ধারার তদবির: তথ্যের জন্য এক পক্ষ অন্য পক্ষকে আবেদন করে
৭। চূড়ান্ত শুনানির তারিখ নির্ধারণ (SD): ইস্যু গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে
৮। চূড়ান্ত শুনানি (PH/FPH): সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন
৯। রায় ঘোষণা: শুনানি শেষ হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে
১০। ডিক্রি প্রদান: রায়ের ৭ দিনের মধ্যে
৬। দেওয়ানি মামলার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
একটি দেওয়ানি মামলা শুধু আইনের কাগজপত্র বা ধারা-উপধারার বিষয় নয়। এর পেছনে থাকে কারো জীবনসংগ্রাম, কারো পরিবার, কারো ভবিষ্যৎ। একজন মা সন্তানের হেফাজত চান—কারণ তিনি ভালোবাসেন। এক ভাই নিজের জমি ফিরে পেতে চান—কারণ সেটা তার শেষ সম্বল। একজন বৃদ্ধা তালাক চান—কারণ তিনি আর অপমান সইতে পারছেন না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচারব্যবস্থাকে শুধু আদালত নয়, মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষার একটা সহানুভূতির জায়গা হিসেবেও দেখতে হবে। একজন বাদী বা বিবাদীর জন্য একটি মামলা মানেই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
৭। সঠিক আইনি জ্ঞানই আপনার শক্তি
সঠিক সময়ে সঠিক আদালতে মামলা দায়ের, উপযুক্ত কাগজপত্র দাখিল এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা থাকলে শুধু হয়রানি নয়, দীর্ঘসূত্রিতাও অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। আইনজীবীর পরামর্শ এবং সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি—দুইয়ের সমন্বয়ই একজন নাগরিকের অধিকার আদায়ের পথ সুগম করতে পারে।
৮। উপসংহার
দেওয়ানি মামলা শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়—এটি মানুষের অধিকার রক্ষার, সম্মান ফিরে পাওয়ার ও পরিবারে-সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক উপায়। সঠিকভাবে আইনগত সহায়তা নিয়ে, সচেতনভাবে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করলেই একজন সাধারণ মানুষও তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে পারেন।

.jpg)