প্রেম, প্রযুক্তি ও প্রতারণা: তরুণদের জন্য একটি সতর্ক বার্তা

 



প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে আজকের তরুণ-তরুণীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে খুব সহজেই নতুন মানুষ পরিচিত হয়, ভালোবাসা গড়ে ওঠে, সম্পর্কের বাঁধনে জড়ানোও হয়। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই একে অপরকে ব্যক্তিগত, এমনকি অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে।

কিন্তু সম্পর্কটা যতটা সহজে গড়ে ওঠে, ভাঙতেও সময় লাগে না। আর তখনই অনেক সময় সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে ব্ল্যাকমেইল বা প্রতিশোধের হাতিয়ার।

বিচ্ছেদের পর ব্ল্যাকমেইল: সম্পর্কের অন্ধকার দিক

অনেকেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকাকে হুমকি দিতে শুরু করে—“ছবিগুলো সবার কাছে পাঠিয়ে দেব”, “ভিডিও ভাইরাল করে দেব”—এই ভয়েই অনেকে দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করে। কেউ কেউ অর্থ, আবার কেউ যৌন সুবিধা আদায়ের চেষ্টাও করে, যাকে "সেক্সটর্শন" বলা হয়।

এই ধরনের আচরণ নিছক 'প্রেমে প্রতারণা' নয়—এটি একটি অপরাধ। আর এই অপরাধ ঠেকাতে এখন বাংলাদেশের আইন আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৩: প্রতিরোধ ও প্রতিকার

২০২৩ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ২৫ ধারা এই ধরণের অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে অবস্থান নিয়েছে।

👉ধারা ২৫ (১) অনুযায়ী, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনে-বুঝে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন বা শিশু যৌন নিপীড়নমূলক উপাদান প্রেরণ, সংরক্ষণ, তৈরি বা হুমকি প্রদান করেন, তাহলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

👉ধারা ২৫ (২) অনুযায়ী, এরকম অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

👉ধারা ২৫ (৩) আরও কঠোর, যদি ভিকটিম হন নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু, তাহলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

📝 আইনটি আরও পরিষ্কারভাবে “ব্ল্যাকমেইলিং” শব্দটির সংজ্ঞা দিয়েছে: যদি কেউ গোপনীয় তথ্য ফাঁসের ভয় দেখিয়ে কাউকে বেআইনি সুবিধা, সেবা বা কাজ করতে বাধ্য করে—তবেই সেটি ব্ল্যাকমেইল।

এছাড়াও 

পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২”-এর ধারা ৮(২) অনুযায়ী, পর্নোগ্রাফি দিয়ে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, মানসিক নির্যাতন চালানো বা ভয় দেখিয়ে সুবিধা আদায় করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

এই আইনগুলো শুধুই কাগজে-কলমে নয়। প্রয়োগও হচ্ছে, তবে তা তখনই কার্যকর হয় যখন ভুক্তভোগী মুখ খোলে, অভিযোগ করে, এবং নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে।



অধিক ইন্টারনেট ব্যবহার, কিন্তু কম সচেতনতা

বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৬১ লাখের বেশি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে আমরা প্রযুক্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করতে হয়, সেটা জানার অভাব এখনও ভয়াবহ।

অনেক তরুণ-তরুণী জানেই না, কীভাবে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখতে হয়, বিপদে পড়লে কোথায় অভিযোগ করতে হয়, কিংবা আইন তাদের জন্য কী ধরনের সুরক্ষা রাখে।

সমাধান: সচেতনতা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা

এখানে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। পরিবার, শিক্ষক, গণমাধ্যম, এনজিও—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। স্কুল-কলেজে "ডিজিটাল আচরণ ও নিরাপত্তা" বিষয়ক ক্লাস চালু করতে হবে।
তরুণদের বোঝাতে হবে—ভালোবাসার প্রমাণ ছবি নয়, সম্মান। প্রযুক্তির ব্যবহার মানে নিরাপদ থাকাও শিখে নেওয়া।


শেষ কথা

আমরা চাই, আমাদের আগামী প্রজন্ম ভালোবাসুক—কিন্তু চোখ বন্ধ করে নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করুক—কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে। আর কোনো তরুণী যেন চোখের জলে ভাঙা সম্পর্কের মূল্য না দেয়, আর কোনো তরুণ যেন অপরাধের ফাঁদে পড়ে না যায়।

সেইজন্য, সচেতন হোন, সাহসী হোন, এবং জানুন—আপনার সম্মান রক্ষায় আইন আছে, দেশ আছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন